বিজ্ঞান
গামা-রে বিস্ফোরণ
শিল্পীর চোখে দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষের দৃশ্য
অষ্টম শতাব্দীর দিকে মারাত্মক গামা-রে বিস্টেম্ফারণের ধাক্কা পৃথিবীতে এসে লেগেছিল। এটা নাকি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে শক্তিশালী গামা-রে বিস্টেম্ফারণের একটি ছিল। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের পারস্পরিক সংঘর্ষকে দায়ী করেছেন। এতে বিপুল পরিমাণে গামা-রে শক্তি মুক্ত
হয়েছিল। সেই আঘাতের চিহ্ন বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং বরফের মধ্যে রয়ে গেছে। গামা-রে হলো দৃশ্যমান আলোর মতো এক ধরনের বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। তবে কম্পনাঙ্ক হার ১০ হাজার গুণ বেশি, যা ১০ ফুট কংক্রিটের দেয়াল ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের গামা-রের চিহ্ন পরমাণু বা হাইড্রোজেন বোমা বিস্টেম্ফারণে লক্ষ্য করা যায়। এই গামা-রে বিস্টেম্ফারণের উৎস রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক জার্নালের শেষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। গামা-রে বিস্টেম্ফারণের চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬০ সালে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। এই বিস্টেম্ফারণের উৎস ছিল পৃথিবীতে বিস্ফোরিত নিউক্লিয়ার বোমা সূর্যের চেয়ে মিলিয়ন-ট্রিলিয়ন গুণ তীব্র।
প্রকৃতিতে রেখে যাওয়া চিহ্ন
২০১২ সালেই গবেষকরা মধ্যযুগে পৃথিবীতে গামা রশ্মির তীব্র আঁচের সাক্ষ্য-প্রমাণ পেয়েছিলেন পৃথিবীর উদ্ভিদ জীবন এবং বরফে। এ ব্যাপারে জাপানের প্রাচীন সিডার গাছের কথা উল্লেখ করেছেন তারা। সেখানে কার্বন মৌলের আইসোটোপ তেজস্ক্রিয় কার্বন-১৪-এর অস্বাভাবিক মাত্রা লক্ষ্য করা গেছে। এন্টার্কটিকার বরফেও এ ধরনের তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করা গেছে। তবে তা বেরিলিয়াম মৌলিক পদার্থের আইসোটোপ তেজস্ক্রিয় বেরিলিয়াম-১০-এর। আবহমণ্ডলের উপরের অংশে নাইট্রোজেন পরমাণুতে তীব্র বিকিরণের আঘাতে এ ধরনের আইসোটোপের সৃষ্টি হয়।
প্রথম দিকে গবেষকরা এ ঘটনার পেছনে সুপারনোভা অর্থাৎ বিস্ফোরণোন্মুখ নক্ষত্রের ভূমিকা আছে বলে মনে করেছিলেন। পরে এটা বাতিল হয়ে যায়। এ রকম ঘটলে এখনও সেখান থেকে নিক্ষিপ্ত এবং সরে যাওয়া টুকরোগুলোকে টেলিস্কোপে দেখা যেত। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক দল গবেষক বলেন, অস্বাভাবিক বিশাল সৌর ফ্লেয়ার বা সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে আগুনের উচ্ছ্বাস পৃথিবীতে এসে ঝাপটা মেরেছিল। সাধারণভাবে এই সময়গুলোতে সূর্যপৃষ্ঠ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ১৬ হাজার কোটি মেগাটন শক্তি নিঃসরণ হয়, যা হিরোশিমায় নির্গত পরমাণু বোমার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি।
এরপরই জার্মান পদার্থবিজ্ঞানীরা জানান, লাখ আলোকবর্ষের ব্যাপ্তি নিয়ে থাকা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রচণ্ড এক ভারী বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল। দুটি গ্যালাক্টিক বস্তুর সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বিস্টেম্ফারণের প্রবল বিকিরণের ঢেউ গ্যালাক্সিব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যালাক্টিক বস্তুগুলো হতে পারে নিউট্রন নক্ষত্র এমনকি কৃষ্ণগহ্বর পর্যন্ত। সূর্যের চেয়ে ৯ গুণ বেশি ভরের বস্তুই এ ধরনের পরিণতি বরণ করে। ১৯৩২ সালে নিউট্রন কণা আবিষ্কারের পর পর ডেভিডোভিচ ল্যান্ডাউ প্রথমে নিউট্রন নক্ষত্রের কথা বলেছিলেন। এ ধরনের নক্ষত্রে ইলেক্ট্রন-প্রোটন বলে কিছু থাকে না। পুরো নক্ষত্রটিই প্রকাণ্ড এক নিউট্রনের পি । সূর্যের মতো নক্ষত্রের যদি এই পরিণতি হয় তাহলে তার ব্যাস হবে মাত্র ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার। অনেকটা নারায়ণগঞ্জ শহরের মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে পৃথিবীতে চা চামচের এক চামচ নিউট্রন নক্ষত্রের পদার্থের ওজন হলো ৫শ' কোটি টন। আর মানুষকে নিউট্রনের ঘনত্ব দিলে তার আকৃতি আলপিনের সমান হবে।
এই গবেষণাপত্রের লেখক এবং জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের প্রফেসর র্যালফ নেউহসার (জধষঢ়য ঘবঁযধঁংবৎ) বলেছেন, কয়েক সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত গামা-রে বিস্ফোরণের বর্ণালির দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম, এটি সন্ধান পাওয়া কার্বন-১৪ ও বেরিলিয়াম-১০-এর উৎপাদন হারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বর, নিউট্রন নক্ষত্র বা সাদা বামন নক্ষত্রের বিস্ফোরণে এ ধরনের বিশাল শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অ্যাডরিয়ান মেলট বলেছেন, যদিও এই সংক্ষিপ্তকালের গামারশ্মির বিস্টেম্ফারণ একটা সম্ভাব্য উপসংহার, তবে সোলার ফ্লেয়ারের ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ ।
এই গামা-রে বিস্ফোরণ খুবই দুর্লভ। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্যালাক্সিতে খুব বেশি হলে প্রতি ১০ হাজার বছরে একবার এমনটি ঘটে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ রকম একটি নাটকীয় ঘটনা সম্পর্কে মধ্যযুগের পূর্বপুরুষরা অবগতই ছিলেন না। তখন জাতিগোষ্ঠীগুলো তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখার মরণ লড়াইয়ে ব্যস্ত। ধর্ম আর বিজ্ঞানে দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পৃথিবী যাচ্ছে_ হাইপেশিয়া, আর্যভট্ট, খনা, ইবনে সিনা, গ্যালিলিও গ্যালিলি, ব্রুনো আরও কত নাম এই সময়ের বলি। প্রফেসর র্যালফ নেউহসার বলেন, এ ধরনের বিস্ফোরণ হাজার আলোকবর্ষ না হয়ে শত আলোকবর্ষ দূরে ঘটলেও এটা ধ্বংস করে ফেলত পৃথিবীর ওজোনস্তর ও প্রাণিজগৎকে। নিজেদের অজান্তেই মহাজাগতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতো পৃথিবী।
http://samakal.net/details.php?news=14&action=main&menu_type=&option=single&news_id=324517&pub_no=1303&type=
বুধবার | ৩০ জানুয়ারি ২০১৩ | ১৭ মাঘ ১৪১৯ |
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন